সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৯:০১ পূর্বাহ্ন
শিরোনাম :
আইসিসিবিতে বারভিডা কার এক্সপো, গাড়ি দেখা ও কেনার সুযোগ ​রাজধানীর অভিজাত শপিংমলগুলোতে ব্যবসায়িক ধস পরিকল্পিত নগরায়ন ও জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত তদারকি জোরদারের তাগিদ মানবিকতার বন্ধনে এক মঞ্চে ১৬ জেলার তিন শতাধিক শুভসংঘ সদস্য আইসিসিবিতে জমজমাট গাড়ির হাট, ছাড়ের সঙ্গে মিলছে নানা উপহার নগরবাসীর হাঁটার মৌলিক অধিকার বনাম অবৈধ দখল বাণিজ্য: ঢাকার ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি পদক্ষেপ বাঞ্ছারামপুরে সুদ-সার্ভিস চার্জ ছাড়াই ১৬৮ নারীর মাঝে ৩০ লাখ টাকা বিতরণ ঢাকাকে টোকিওর মতো পরিচ্ছন্ন করার লক্ষ্য সরকারের: প্রধানমন্ত্রী মুঘল খাবার ও সুফি সুরে আইসিসিবি হেরিটেজ রেস্টুরেন্টে ৮ সপ্তাহের সংগীত উৎসব ঢালাও সাজা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের আশঙ্কা: আইনের শাসন রক্ষায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের দাবি

নগরবাসীর হাঁটার মৌলিক অধিকার বনাম অবৈধ দখল বাণিজ্য: ঢাকার ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি পদক্ষেপ

  • আপডেট সময় : শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬
  • ১১ বার পঠিত

রাজধানীর ফুটপাতগুলো এখন সাধারণ পথচারীদের চলাচলের বদলে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অবৈধ বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের তথ্য ও বিভিন্ন গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনের ফুটপাত থেকে শুধু চাঁদাবাজির মাধ্যমেই বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এই বিশাল অংকের অবৈধ বাণিজ্য কেবল পথচারীদের চলাচলের অধিকারই ক্ষুণ্ন করছে না, বরং নগরবাসীর জনজীবনকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

​ফুটপাতে চাঁদাবাজির চিত্র ও পরিসংখ্যান
​হকার ও চাঁদার পরিমাণ: বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে নিয়মিত প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার হকার রয়েছে, যা ঈদের সময়ে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজারে। গড়ে হকারপ্রতি প্রতিদিন ৩০০ টাকা চাঁদা তোলা হলে প্রতিদিন আদায় হয় প্রায় আট কোটি টাকার বেশি। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর গবেষণায় অতীতে ১,৮২৫ কোটি টাকার কথা বলা হলেও বর্তমানে এই পরিমাণ স্ফীত হয়ে ৩ হাজার কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে বলে একজন গবেষক গবেষক নিশ্চিত করেছেন।

​এলাকাভিত্তিক দৌরাত্ম্য: গুলিস্তান, নিউ মার্কেট, বায়তুল মোকাররম, পল্টন, মতিঝিল, দৈনিক বাংলা মোড়, গোলাপশাহ মাজার, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এবং ফুলবাড়িয়া এলাকায় ফুটপাতে দোকানপাটের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তবে ঢাকার প্রায় প্রতিটি অলিগলিতেই ছোট-বড় দোকান বা ভ্যান থেকে প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা চাঁদা তোলা বাধ্যতামূলক।

​আকার ও পদের ভিত্তিতে চাঁদার হার: টেবিল বা চৌকির আকৃতি এবং পণ্যের ধরনের ওপর নির্ভর করে চাঁদার পরিমাণ ১০০ টাকা থেকে শুরু করে দেড় হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। এছাড়া বাল্বপ্রতি ১০০ টাকা বিদ্যুৎ বিলের নামে এবং নিরাপত্তার নামে অতিরিক্ত চাঁদা আদায় করা হয়।

​চাঁদাবাজির নেপথ্য সিন্ডিকেট ও অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা

​হকারদের অভিযোগ এবং গবেষকদের তথ্যমতে, এই চাঁদাবাজির একটি সুনির্দিষ্ট নেটওয়ার্ক রয়েছে। ব্র্যাক আইজিডি-র গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, আদায়কৃত এই চাঁদার অর্থের ভাগ তিন ভাগে বিভক্ত হয়:

​পুলিশ: ৩০ শতাংশ (পুলিশের লাইনম্যান ও উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত এই অর্থ পৌঁছে যায়)।

​নিয়ন্ত্রণকারী ও লাইনম্যান: ৪০ শতাংশ (যারা ফুট বিক্রি এবং চাঁদা আদায়ের মাঠ পর্যায়ের স্থায়ী নেটওয়ার্ক পরিচালনা করে)।

​স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা: ৩০ শতাংশ (রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও এই সিন্ডিকেটের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তন আসে না)।

​পুলিশ ও সিটি কর্পোরেশন বরাবরই এই চাঁদাবাজির অভিযোগ অস্বীকার করে এলেও এবং নির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেও, বাস্তবে এর কোনো স্থায়ী প্রতিকার মিলছে না।

​ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি বন্ধে পরামর্শমূলক নির্দেশনা

​ঢাকার ফুটপাতকে দখলমুক্ত এবং চাঁদাবাজিমুক্ত করতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদী পদক্ষেপ গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। নিচে সুনির্দিষ্ট কিছু পরামর্শমূলক নির্দেশনা তুলে ধরা হলো:

​১. হকারদের জন্য সুনির্দিষ্ট লাইসেন্স ও নিবন্ধনের ব্যবস্থা

​ঢাকা শহরের নিবন্ধিত হকারদের একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ তৈরি করে তাদের পরিচয়পত্র (ID Card) ও ব্যবসার বৈধ অনুমোদন বা লাইসেন্স দিতে হবে।

​নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় তাদের কাছ থেকে সরকারিভাবে নির্ধারিত টোল বা ফি আদায় করা হলে তা সরাসরি সরকারি তহবিলে জমা হবে, যা অবৈধ সিন্ডিকেটের পকেটে না গিয়ে রাষ্ট্রের আয়ের উৎস হিসেবে কাজ করবে।

​২. চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট ও লাইনম্যানদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি

​পুলিশ, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী এবং লাইনম্যানদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা অবৈধ চাঁদাবাজ চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

​চাঁদাবাজির সাথে জড়িত প্রশাসন বা সিটি কর্পোরেশনের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

​৩. সময়ভিত্তিক ও স্থানভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থাপন (Zoning & Time-sharing)

​ফুটপাত সাধারণ পথচারীদের চলাচলের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত রাখতে হবে। তবে হকারদের জীবিকার বিষয়টি মানবিক বিবেচনায় রেখে কম জনবহুল নির্দিষ্ট গলি বা নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন—সন্ধ্যার পর বা ছুটির দিনে) হকারদের বসার সুনির্দিষ্ট জায়গা নির্ধারণ করে দেওয়া যেতে পারে।

​হকারদের দীর্ঘমেয়াদে ফুটপাত থেকে সরিয়ে আধুনিক মার্কেট, নির্ধারিত হকার্স মার্কেট বা হকার্স কর্নারে পুনর্বাসন করতে হবে।

​৪. তদারকি কমিটি ও নাগরিক কমিটি গঠন

​ফুটপাত দখল ও চাঁদাবাজি রোধে স্থানীয় সরকার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং নাগরিকদের (স্থানীয় প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজ) নিয়ে একটি স্বাধীন তদারকি বা মনিটরিং সেল গঠন করতে হবে।

​নিয়মিত এবং স্বচ্ছ উচ্ছেদ অভিযان পরিচালনার পাশাপাশি উচ্ছেদের পর পুনরায় যাতে কোনো সিন্ডিকেট সেখানে বসতে না পারে, তার স্থায়ী পাহারা নিশ্চিত করতে হবে।

​ফুটপাত কেবল ব্যবসার জায়গা নয়, এটি নগরবাসীর হাঁটার মৌলিক অধিকার। রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির শৃঙ্খল ভেঙে ঢাকাকে পথচারীবান্ধব ও জনবহুল ও বাসযোগ্য করে তুলতে প্রশাসন ও সিটি কর্পোরেশনের যৌথ ও কঠোর সদিচ্ছা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

Facebook Comments Box

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ